আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে থাকে ডিএনএ। কোষের এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আবিষ্কারের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও ধৈর্য। উনিশ শতকের শেষভাগ। ১৮৬৯ সালে সুইজারল্যান্ডের তরুণ বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক মিশার পুঁজযুক্ত ক্ষত থেকে শ্বেত রক্তকণিকা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছিলেন। কোষের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কাজ করতে গিয়ে নিউক্লিয়াসের ভিতর একধরনের অজানা পদার্থ পেলেন তিনি। সাধারণ প্রোটিনের থেকে ফসফরাসযুক্ত এই উপাদান একেবারে আলাদা। ফ্রেডরিক এর নাম দিলেন, নিউক্লিন। তখনও কেউ জানতেন না, এই নিউক্লিনই পরবর্তীতে ডিএনএ হিসেবে পরিচিত হবে।

মিশারের আবিষ্কার সেই সময় তেমন গুরুত্ব পায়নি। কারণ তখন সিংহভাগ বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্যের মূল উৎস প্রোটিন। ডিএনএ-এর গঠন অপেক্ষাকৃত সরল হওয়ায় সেটি রইল আড়ালে। গবেষণায় নতুন মোড় আসে১৯২৮ সালে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক গ্রিফিথ নিউমোনিয়া রোগের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তিনি মূলত দু’টি প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া নেন। একটি প্রাণঘাতী, অপরটি প্রাণঘাতী নয়। পরীক্ষায় দেখা গেল, মৃত প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার কোনও একটি উপাদান নিরীহ ব্যাকটেরিয়াকে প্রাণঘাতী বানিয়ে দিতে পারে। যদিও কেন এমনটা হল, এর জবাব দিতে পারেননি ফ্রেডেরিক। তবে তাঁর গবেষণা প্রমাণ করেছিল, কোষের ভিতরে এমন কিছু আছে যা জিনগত বৈশিষ্ট্যকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দিতে পারে। ১৯৪৪ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী অসওয়াল্ড অ্যাভেরি, কলিন ম্যাকলিওড ও ম্যাকলিন ম্যাকার্টি গ্রিফিথের গবেষণার সূত্র ধরে প্রমাণ করলেন যে এই পরিবর্তনের বাহক প্রোটিন নয়, বরং ডিএনএ। তাঁরা প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন, আরএনএ ও ডিএনএ আলাদা করে প্রতিটি উপাদান পরীক্ষা করেছিলেন। দেখা গেল, কেবলমাত্র ডিএনএ অক্ষত থাকলে পরিবর্তন ঘটে। যদিও অনেকেই এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। ১৯৫২ সালে আলফ্রেড হার্শি ও মার্থা চেসের পরীক্ষায় দেখা যায়, ভাইরাস যখন ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমণ ঘটায়, তখন কেবল ডিএনএ-ই প্রবেশ করে এবং নতুন ভাইরাস তৈরিতে সাহায্য করে। প্রোটিন নয়। প্রমাণিত হল, জেনেটিক তথ্যের বাহক ডিএনএ।
এদিকে, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন এবং মরিস উইলকিনস এক বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএ-এর ছবি তুলতে শুরু করেন। ফ্র্যাঙ্কলিনের তোলা ‘ফটো ৫১’ ডিএনএ-এর গঠন বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৩ সাল। বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করলেন ডিএনএ-এর রূপ। চারগাফের নিয়ম ও ফ্র্যাঙ্কলিনের ছবির সাহায্যে ডিএনএ-এর ডাবল হেলিক্স গঠন প্রস্তাব করেন তিনি। দেখান, ডিএনএ দু’টি লম্বা সুতোর মতো। একে অপরের চারপাশে পাক খেয়ে থাকে এবং বেস-পেয়ারিংয়ের মাধ্যমে জিনের নানা তথ্য সংরক্ষণ করে।
লিখেছেন: শান্তনু দত্ত
Comments
Post a Comment